অবহেলা-অযত্নে আজও কালীর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে নওগাঁর ৬৭টি বধ্যভূমি

মোহাম্মদ আককাস আলী,নওগাঁ জেলা প্রতিনিধি:




১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে সারা দেশের মতো নওগাঁতেও পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বর্বরতম হামলা, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ, নারী নির্যাতন ও গণহত্যার মতো বিভীষিকার সাক্ষী রেখে গেছে।

ওই সময়ে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসরদের বর্বরতার চিহ্ন নওগাঁর বিভিন্ন বধ্যভূমিতে রয়েছে। এসব স্থানে গণহত্যা চালিয়ে লাশগুলো গাদাগাদি করে পুঁতে রাখা হত।

দীর্ঘদিন এসব বধ্যভূমি আবিষ্কার করে যথাযথ সংরক্ষণ করে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি এসব বধ্যভূমির তালিকা তৈরি এবং কিছু কিছু বধ্যভূমিতে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হলেও অধিকাংশই আজও অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

স্মৃতিফলক ও সীমানাপ্রাচীর না থাকায় সারা বছরই এসব বধ্যভূমি ও গণকবর ঝোপঝাড়ে ভরে থাকে। অনেক সময় বধ্যভূমিতে গরু-ছাগল চরান স্থানীয়রা।

তথ্য অনুসন্ধানে জানাগেছে,জেলার ১১টি উপজেলায় ৬৭টি বধ্যভূমির সন্ধান মিলেছে। 


এগুলোর মধ্যে নওগাঁ সদর উপজেলায় ১৫টি, মহাদেবপুর উপজেলায় পাঁচটি, বদলগাছি উপজেলায় ছয়টি, মান্দা উপজেলায় চারটি, পত্মীতলা উপজেলায় সাতটি, আত্রাই উপজেলায় ১৩টি, রাণীনগর উপজেলায় তিনটি, ধামইরহাট উপজেলায় তিনটি, নিয়ামতপুর উপজেলায় দুটি, সাপাহার উপজেলায় আটটি এবং পোরশা উপজেলায় একটি বধ্যভূমি রয়েছে।

নওগাঁর সবচেয়ে বড় গণহত্যার ঘটনাটি ঘটে মান্দা উপজেলার পাকুরিয়া গ্রামে। ১৯৭১ সালের ২৮ আগস্ট সকালে পাকিস্তানি বাহিনী তাদের দোসর রাজাকার-আলবদরদের সঙ্গে নিয়ে পাকুরিয়া গ্রাম ঘেরাও করে। তারা ওই গ্রামের বাসিন্দাদের পাকুরিয়া স্কুল মাঠে এনে জড়ো করে বেপরোয়া গুলি চালায়। এতে ১২৮ জন শহীদ হন।


পাকুরিয়ার গণহত্যায় নিহত ৭৩ জনের নাম পাওয়া গেছে। পাকিস্তানি বাহিনী সেখান থেকে চলে গেলে গ্রামবাসী লাশগুলোকে একই কবরে পুঁতে রাখেন। এটি পাকুরিয়া বধ্যভূমি নামে পরিচিতি লাভ করে।


এই উপজেলায় অপর তিনটি বধ্যভূমির মধ্যে ১৯৭১ সালের ৬ নভেম্বর ভাঁরশো ইউনিয়নের কবুলপুর গ্রামে গুপ্তির পুকুর পাড়ে পাকিস্তানি বাহিনী চারজনকে গুলি করে হত্যা করে। তারা মরদেহগুলো একই কবরে পুঁতে রাখে। এটি কবুলপুর গণহত্যা নামে পরিচিত।

জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম গণহত্যা সংঘটিত হয় রাণীনগর উপজেলার আতাইকুলা গ্রামে। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল সকাল ৮টায় এই গ্রামে পাকিস্তানি বাহিনীর গুলিতে ৫২ জন মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল আতাইকুলা গ্রামের সবুজ চত্বর। পরে একটি গর্তে লাশগুলো পুঁতে রাখা হয়। এটি আতাইকুলা গণহত্যা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে। এখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়েছে।


রাণীনগর উপজেলায় বড়বড়িয়া গ্রামে ১৯৭১ সালের ১৯ নভেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান টের পেয়ে পাকিস্তানি বাহিনী আক্রমণ চালিয়ে পাঁচজন বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ সাতজনকে গুলি করে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এটি বড়বড়িয়া গণহত্যা নামে পরিচিত।

এই উপজেলার অপর গণহত্যার ঘটনাটি ঘটেছিল হরিপুর রাণীভবানী জঙ্গলে। পাকিস্তানি বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় শিশুসহ ১০ জনেরও বেশি মানুষকে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে।


১৯৭১ সালের ২৫এপ্রিল নওগাঁ সদর উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের দোগাছি গ্রামের একটি পুকুরে দোগাছি, কিদিরপুর, পিরোজপুর ও শিমুলিয়া ইত্যাদি গ্রাম থেকে ধরে এনে মোট ৫৫ ব্যক্তিকে গুলি করে এবং রাইফেলের বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে মাটিচাপা দিয়ে রাখে।


মহাদেবপুর উপজেলার দেবীপুর গ্রামে ২৬ এপ্রিল সকাল ১০টায় নয় জনকে এবং একই দিনে উপজেলার মহিষবাতান গ্রামে আক্রমণ চালিয়ে মোট ৩০ জনকে হত্যা করে। এদের মধ্যে ১২ জনের পরিচয় পাওয়া গেলেও ১২ জনের পরিচয় পাওয়া যায়নি। তাদের একই স্থানে মাটিচাপা দেয়া হয়।

বদলগাছী উপজেলায় ৮ নভেম্বর পাক হানাদারদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে কমপক্ষে দুইজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন।

৭ অক্টোবর ঐতিহাসিক পাহাড়পুর এলাকায় দুইজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিসহ মোট সাতজনকে গুলি করে হত্যা করে পাকিস্তান সেনাবাহিনী।

বদলগাছি উপজেলার মির্জাপুর এলাকায় নয়জন মুক্তিযোদ্ধা গন্তব্যে যাওয়ার সময় পাকিস্তানি বাহিনী তাদের আটক করে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে গুলি করে। এসময় এদের মধ্যে ছয়জন শহীদ হন। নিহতদের সেখানে গণকবর দেয়া হয়।

News Publisher (Editor Cheif)

মহাদেবপুরের খবর এর সকল নিউজের সঠিক এডিটিং কনফার্মেশন এর দায়িত্বে নিয়োজিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন